Tuesday, June 21, 2011

বার্ধক্য ও বিষণ্নতা


দেহের অসুখ হলে আমরা যাই চিকিৎসকের কাছে। কিন্তু মনের অসুখ হলে আমরা সেটা চেপে রাখার চেষ্টা করি, যা ঠিক নয়। অত্যধিক বিষণ্নতা মনের একটি দুর্বল ও কষ্টকর মুহূর্তের অনুভূতি, যার জন্য উচিত মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
বিষণ্নতা সাধারণ কতগুলো আবেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তবে বিষণ্ন আবেগ যদি এতটাই হয় যে এটি সাধারণ কাজকর্ম বা অন্যান্য ক্রিয়াকর্মের বাধা সৃষ্টি করে বা এর কারণে ব্যক্তিজীবন ব্যাহত হয়, তখন এই বিষণ্ন আবেগকে আমরা বিষণ্নতা বলে থাকি। বিষণ্ন আবেগের প্রকাশ ১৫ দিন থাকলে এবং ওই ব্যক্তির কাজে ব্যাঘাত ঘটলে এই বিষণ্নতা রোগের চিকিৎসা নেওয়া দরকার।


বার্ধক্যে বিষণ্নতা উপসর্গ বা রোগ আকার ধারণ করার আশঙ্কা অনেক বেশি। প্রতি ৩০ জনে একজন বয়স্ক ব্যক্তি এই বিষণ্নতা রোগে ভুগতে পারেন, যার চিকিৎসা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। 

বিষণ্নতা রোগে কী কী হয়
দুঃখবোধ অনুভব করা কিংবা মন খারাপ লাগা বিষণ্নতার প্রধান উপসর্গ। এ ছাড়া জীবনের উৎসাহ হারিয়ে ফেলা; আগে যেসব ব্যাপারে আপনি আগ্রহ প্রকাশ করতেন, এখন সেগুলো উপভোগ করতে না পারা। কোনো কারণ ছাড়াই অতি ক্লান্তি, খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া, কোনোভাবে বিশ্রাম করতে না পারা, অস্থির লাগা, অত্যধিক দুশ্চিন্তা করা, চেনা লোকদের এড়িয়ে চলা, অল্পতেই রাগ কিংবা উত্তেজিত হওয়া, ঘুমের সমস্যা, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা, নিজেকে অন্যের বোঝা মনে করা, মনোযোগের অসুবিধা, যৌন অনুভূতি কমে যাওয়া ও আত্মহত্যা করার চিন্তা মাথায় আসা বিষণ্নতার কারণ।
অনেক প্রবীণ ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে থাকেন, এর সঙ্গে যদি বিষণ্নতা রোগটি থাকে তাহলে সার্বিক অসুস্থতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে শরীরের মূল অসুখটির চিকিৎসা করার পাশাপাশি বিষণ্নতা রোগের চিকিৎসা করাও প্রয়োজন। বার্ধক্য স্মৃতিশক্তির ওপর একটি ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে, ছিন্নভিন্ন করে দেয় স্মৃতিশক্তির বিভিন্ন চালিকাকে। 
বিষণ্নতা তথা অন্যান্য শারীরিক অসুবিধায় মানুষের স্মরণশক্তিতে যে ঘাটতি ঘটে, তাকে আমরা ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশতা বলতে পারি। তবে বিষণ্ন অবস্থায় স্মৃতিভ্রংশতার চিকিৎসা করালে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। একাকিত্ব বোধ করা বিষণ্নতা রোগের একটি বিরাট উপসর্গ। অনেক ক্ষেত্রে এটি একমাত্র উপসর্গ আকারে থাকতে পারে। 
বিষণ্নতা কেন হয়
বিষণ্নতা কেন হয়, এর কারণ এখনো অজানা। তবে কতগুলো কারণ নিয়ে আলোচনা করা যায়—
১. দুঃখজনক ঘটনা: কারও জীবনসঙ্গিনীর মৃত্যু বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃত্যু বা অন্য কোনো আঘাতজনিত কারণ বিষণ্নতা রোগের সৃষ্টি করতে পারে। 
২. পারিবারিক বা বংশগত কারণ: বিষণ্নতা রোগ পরিবারের মধ্যে বাবা বা মায়ের থাকলে সন্তানের হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। 
৩. শারীরিক অসুস্থতা: নানা রকম স্নায়ুরোগের কারণ, পারকিনসনিজম, স্ট্রেস, ক্যানসার, থাইরয়েড সমস্যা প্রভৃতি থেকে বিষণ্নতা রোগ তৈরি হতে পারে। 
৪. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: বিভিন্ন ধরনের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বিষণ্নতা রোগের সৃষ্টি হতে পারে। 

নিজেকে যেভাবে সাহায্য করবেন
বার্ধক্য জীবনের এক নিশ্চিত অধ্যায় এবং বার্ধক্যকে নিজের দুর্বলতা না ভেবে জীবন উপভোগের অন্য এক পন্থা মনে করতে হবে। বাইরে বের হন, বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার যথাযোগ্য চিকিৎসা নিন, মনের মধ্যে হীনম্মন্যতা পরিত্যাগ করে উৎফুল্ল ভাব আনার চেষ্টা করুন। 
প্রয়োজনমাফিক আহার করুন। যতটুকু আহার করছেন তাতে যেন পুষ্টি উপাদান থাকে, ভিটামিন কিংবা মিনারেলস আছে কি না, এদিকে লক্ষ রাখুন। শুকনো চকলেট বা বিস্কুটজাতীয় খাবার পরিত্যাগ করুন। 
আঁশজাতীয় খাবার বেশি করে খান, শর্করাজাতীয় খাবার কম করে খাওয়ার চেষ্টা করুন। নিজে নিজেকে বলুন, ‘আপনি সুস্থ আছেন, সুস্থ থাকবেন।’ 
মনের ভেতরের আবেগ দমিয়ে না রেখে কারও কাছে প্রকাশ করুন, বন্ধু কিংবা স্ত্রী যে কারও সঙ্গে। নিজে থেকে কোনো রকম ওষুধপত্র সেবন করবেন না। প্রয়োজনমাফিক ঘুম দরকার ও কিছুটা শারীরিক ব্যায়ামের প্রয়োজন রয়েছে। শারীরিক ব্যায়ামের মধ্যে ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচ দিন হাঁটা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বিষণ্নতার চিকিৎসা
ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কাউন্সেলিং বা সাপোর্টিভ সাইকোথেরাপি, গ্রুপ থেরাপি বিষণ্নতায় আক্রান্তদের বেশ কাজে দেয়। কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া-সম্পন্ন ওষুধ কেবল বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত সেবন করা দরকার। জীবনে আশা ধরে রাখুন, বার্ধক্যকে জীবনের নতুন পরিবর্তন মনে করে ইতিবাচক ও আনন্দের চোখে দেখুন, সুস্থ থাকুন।


মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ
মনোজগৎ সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা

সূত্র:প্রথমআলো.২১/০৬/২০১১

No comments:

Post a Comment